শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানো নিয়ে ভারতের নীরব কূটনীতি

শেয়ার করুন

মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা। রায় ঘোষণার পরেও ভারত এ বিষয়ে কোনো পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য করেনি। দুই দেশের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির ধারা অনুযায়ী দিল্লির ফেরত না দেওয়ার সুযোগ থাকলেও, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন—হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি জানিয়ে নতুন করে চিঠি পাঠানো হবে।

ট্রাইব্যুনালের রায়

সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক মন্ত্রী কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর আগে আদালত অবমাননার অভিযোগে গত ২ জুলাই শেখ হাসিনাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নতুন রায়ের ফলে তিনি এখন পলাতক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।

ঢাকার অবস্থান

রায়ের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানায়, মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিকে অন্য দেশে আশ্রয় দেওয়া অবন্ধুসুলভ আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞা। বিবৃতিতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানানো হয়—দণ্ডপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তিকে দ্রুত বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে, যা দুই দেশের বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারতের “অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব”।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, “আজ রাতেই বা আগামীকাল সকালে ভারতের কাছে নতুন করে চিঠি পাঠানো হবে। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন—বিচার সম্পন্ন হয়েছে, তাঁরা দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।”

গত বছরের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ চিঠি পাঠালেও ভারত শুধু প্রাপ্তি স্বীকার করেছিল, কোনো জবাব দেয়নি।

ভারতের ফেরত না দেওয়ার সুযোগ কোথায়

২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি ও ২০১৬ সালের সংশোধিত চুক্তি অনুযায়ী—

  • গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকলেই প্রত্যর্পণ সম্ভব,
  • অপরাধের প্রমাণ পাঠানোর প্রয়োজন নেই।

তবে সংশোধিত চুক্তিতে এমন একটি ধারা রয়েছে, যার মাধ্যমে ভারত ফেরত না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কোনো দেশ মনে করলে অভিযোগগুলো ন্যায়বিচারের স্বার্থে আনা হয়নি বা সেখানে ন্যায্য বিচার নাও হতে পারে—তাহলে প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।

ভারতের বিপক্ষে শেখ হাসিনার কোনো অভিযোগ বা মামলা নেই, তবু চুক্তির এই ধারা ব্যবহার করে দিল্লি ফেরত না দেওয়ার পথ পেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের জিন্দাল গ্লোবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত বলেছেন, “ভারত শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না।” তার মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধ নিয়ে সন্দেহ নেই এবং হাসিনার বিরুদ্ধে গুলি করার নির্দেশের অভিযোগও রয়েছে।

আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—ফাঁসির রায় হওয়ায় প্রাণসংকটের যুক্তি দেখিয়ে ভারত প্রত্যর্পণ না করলেও চুক্তিভঙ্গ হবে না। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরীর মন্তব্য, “ফাঁসির রায়ের কারণে ঝুঁকি আছে—ভারত ফেরত দিতে বাধ্য নয়।”

ভারতের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি

রায়ের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তারা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে। বিবৃতিতে বলা হয়—
“নিকট প্রতিবেশী হিসেবে আমরা বাংলাদেশের শান্তি, গণতন্ত্র, অন্তর্ভুক্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে সম্পৃক্ত থাকব।”

ভারতে মতবিভাজন

কলকাতা প্রতিনিধি জানায়—মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে মত থাকলেও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য রায়কে স্বাগত জানিয়েছে সুশীল সমাজের একটি অংশ ও মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিজেপি আওয়ামী লীগের সুরে রায়কে “ষড়যন্ত্র ও প্রতিহিংসা” বলছে।

কলকাতার আইনজীবী এ জামান বলেন, “বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছে, শেখ হাসিনার ভূমিকা ক্ষমার অযোগ্য।”
এপিডিআরের রাজ্য সম্পাদক রঞ্জিত সুর বলেন, “আমরা মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী, তবে অভিযোগগুলোর কঠোর বিচার হওয়া অনিবার্য ছিল। ভারত স্পষ্ট করুক—হাসিনা আশ্রয়ে আছেন কি না।”

সাম্প্রতিক খবর

এই বিভাগের আরও খবর