স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার একতলা ভবন নির্মাণে সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল ৯ মাস। কিন্তু শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) অধীনে এসব ভবন নির্মাণকাজ চার বছরেও শেষ হয়নি। কাজের বড় অংশ ফেলে রাখা হলেও ঠিকাদাররা বিলের ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত তুলে নিয়েছেন। নিম্নমানের কাজ, অর্ধসমাপ্ত ভবন, অতিরিক্ত বিলসহ বিভিন্ন অনিয়মে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর যোগসাজশে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
গত বছর আগস্টে সরকার পরিবর্তনের পর সংশ্লিষ্ট অনেক ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে যায়। ফলে বহু নির্মাণাধীন ভবন দীর্ঘদিন ধরে অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে শিক্ষার্থীরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছে।
অনিয়ম তদন্তে পাঁচ প্রকৌশলী ও ১১ ঠিকাদারকে তলব করেছিল ইইডির তদন্ত কমিটি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ২৩ অক্টোবর তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পর গত বুধবার আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়। সোমবার তারা তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হয়ে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হন।
অভিযুক্ত প্রকৌশলীরা হলেন—
- মো. আসাদুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অধিশাখা-২)
- মীর মুয়াজ্জেম হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পিআরএল)
- মো. জরজিসুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক)
- এ কে এম মনিরুজ্জামান, উপসহকারী প্রকৌশলী
- জামিল হোসেন, উপসহকারী প্রকৌশলী
১১ ঠিকাদারের নাম এখনো জানা যায়নি।
সম্প্রতি নাটোরের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে। দীর্ঘদিন নাটোরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আসাদুজ্জামান। তাঁর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঠিকাদারদের সঙ্গে যৌথভাবে অর্থ আত্মসাত, কমিশন বাণিজ্য, সুবিধাজনক পদে বদলি পেতে আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
অতিরিক্ত বিল, পালানো ঠিকাদার ও স্থবির নির্মাণকাজ
তদন্ত কমিটি জানায়, নাটোরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজেই সবচেয়ে বেশি অনিয়ম দেখা গেছে। যেমন—
- বিলমারিয়া দাখিল মাদ্রাসা (২০২১ সালের কার্যাদেশ): ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার কাজের ৩০% এখনও বাকি। কিন্তু ৭০ লাখ টাকা বিল আগেই পরিশোধ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার এখন আত্মগোপনে।
- বারঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় (২০২২ সালের কার্যাদেশ): ৮০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার কাজের ৪৫% বাকি। অথচ ৭২ লাখ টাকা বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদার।
- বিলমারি উচ্চ বিদ্যালয়: ৪০% কাজ বাকি থাকা সত্ত্বেও ৭২ লাখ টাকা বিল প্রদান করা হয়েছে।
নাটোরে এ ধরনের একাধিক ভবনে একইভাবে অর্ধসমাপ্ত কাজ রেখে বিল উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব বিল ঠিকাদারদের সঙ্গে প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের যোগসাজশে ভাগাভাগি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর আগেও রংপুরে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ কোটি টাকার কাজ ছাত্রলীগের এক নেতাকে পাইয়ে দিতে কারসাজির অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। তখন বিষয়টি চাপা পড়ে যায়।
পদোন্নতি ও বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ
দীর্ঘদিন নাটোরে দায়িত্ব রাখার পর আসাদুজ্জামান বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (অধিশাখা-২) এবং ঢাকা মেট্রো সার্কেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। পাশাপাশি নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বেও রয়েছেন।
অভিযোগ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি সাক্ষাৎ দেননি; ফোন কল কেটে দেন এবং বার্তারও জবাব দেননি।
অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জরজিসুর রহমান বলেন, “আমাদের পাঁচজনের নামে অভিযোগ থাকলেও সবার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ নয়।”
তদন্ত কমিটির প্রধান ও ইইডির পরিচালক মামুনুর রশিদ জানান, “অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।”
ইইডির প্রধান প্রকৌশলী তারেক আনোয়ার জাহেদী বলেন, তদন্ত কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করছে; তাই মন্তব্য করতে চান না।


