শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

নারী উন্নয়ন ফোরাম: ফরিদপুরের নারীদের আলোকবর্তিকা

শেয়ার করুন

ফরিদপুরের বিভিন্ন গ্রাম–মহল্লায় যখন দিন বদলের স্রোত বইছে, তখন সেই স্রোতের সামনের সারিতে যে সংগঠনটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে, সেটি হলো নারী উন্নয়ন ফোরাম। স্থানীয় অসহায়, দরিদ্র এবং কর্মহীন নারীদের জীবনে পরিবর্তনের হাতছানি এনে দিয়েছে এই সংগঠনটি—যারা বিশ্বাস করে, “একজন নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা শুধু একটি পরিবারই নয়, পুরো সমাজকে বদলে দিতে পারে।”

নারী উন্নয়ন ফোরাম প্রতিষ্ঠিত হয় নারীদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে। বিশেষ করে ফরিদপুর ও আশপাশের উপজেলাগুলোর পিছিয়ে পড়া নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য বিশেষ প্রকল্প হাতে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। এর অন্যতম মূল নেতৃত্ব আফরোজা সুলতানা, যিনি নিজস্ব উদ্যোগ ও আগ্রহে নারীদের পাশে দাঁড়ানোর এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন।

তিনি বলেন, “নারী শুধু ঘরের ভেতর আটকে রাখার মানুষ নয়। নারীই পারে ভাঙা পরিবার জোড়া লাগাতে, পারে সমাজকে আলোকিত করতে।” তার এই বিশ্বাসই আজ শত শত নারীর জীবনে নতুন সূর্যের আলো এনে দিয়েছে।

২০১৯ সালে ফোরামটি শুরু করে “দুস্থ ও অসহায় নারীদের আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ প্রকল্প।” প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল—হাতে–কলমে এমন কিছু শেখানো, যা নারীদের নিজ পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রগুলো ছিল—

  • বিউটিফিকেশন
  • দর্জি ও সেলাই
  • হস্তশিল্প
  • ব্লক–বাটিক
  • কম্পিউটার
  • ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যবস্থাপনা

এ সবগুলো প্রশিক্ষণই দেওয়া হয় সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা অত্যন্ত স্বল্প খরচে। প্রশিক্ষণ শেষে নারীদের অনেকেই ক্ষুদ্র ঋণ, যন্ত্রপাতি বা উপকরণ পেয়ে নিজ ঘরে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে পেরেছেন।

নারী উন্নয়ন ফোরামের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো প্রায় ৩৪৮ জন নারীকে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দাঁড় করানো। কেউ সেলাই মেশিন নিয়ে নিজের ছোট ব্যবসা চালাচ্ছেন, কেউ বিউটি পারলার খুলেছেন, আবার কেউ ব্লক–বাটিক ও হস্তশিল্প তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করছেন।

ফরিদপুরের কৃষ্ণনগরের রুনা বেগম বললেন,
“আমি আগে স্বামী–নির্ভর ছিলাম। ফোরামের প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন নিজে আয় করি। মেয়ের পড়াশোনার খরচ আর কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না।”

এই বাস্তব সাফল্যগুলোই প্রমাণ করে—সঠিক দিকনির্দেশনা, সহায়তা এবং সুযোগ পেলে একজন নারী সমাজ বদলে দিতে পারে।

নারী উন্নয়ন ফোরাম শুধুমাত্র প্রশিক্ষণেই থেমে নেই। তারা নিয়মিত আয়োজন করে—

  • নারীর অধিকার ও আইনি সচেতনতা বিষয়ক সেমিনার
  • বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ প্রচারনা
  • পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ে কাউন্সেলিং
  • স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক কর্মশালা

এসব কার্যক্রম স্থানীয় নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বাধাও কম নয়। অর্থের সীমাবদ্ধতা, নারীদের পরিবার থেকে অনুমতি না পাওয়া, এবং বাজার–সংযোগের অভাব বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও নারী উন্নয়ন ফোরাম এগিয়ে যাচ্ছে দৃঢ় মনোবল নিয়ে।

ভবিষ্যতে তারা—

  • আরও বড় পরিসরে উদ্যোক্তা তৈরির পরিকল্পনা
  • অনলাইন মার্কেটপ্লেস তৈরি
  • নারীদের জন্য কো–ওয়ার্কিং স্পেস
  • কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসার প্রসার

—এই লক্ষ্যগুলো নিয়ে কাজ করছে।

ফরিদপুরের নারীদের জীবনে নারী উন্নয়ন ফোরাম শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়—এটি এক আলোর দিশারী। যারা একসময় সমাজের প্রান্তে পড়ে ছিলেন, তারা এখন নিজের পরিবার, সমাজ এমনকি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

নারী উন্নয়ন মানে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়—এটি আত্মসম্মান, স্বাধীনতা, নিজের মূল্যবোধ ফিরে পাওয়া। আর সেই দায়িত্বটাই নিঃস্বার্থভাবে পালন করছে নারী উন্নয়ন ফোরাম।

সাম্প্রতিক খবর

এই বিভাগের আরও খবর