লক্ষ্মীপুরের রামগতির মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন চর পাঁচটি। এর মধ্যে তিনটি চর উপজেলার মধ্যে স্বতন্ত্র অবস্থান করে নিয়েছে। চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ঘাস আচ্ছাদিত ভূমিতে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মহিষের বাথান; যেখান থেকে বছরে মিলছে প্রায় চার হাজার ৩৮০ টন দুধ। রামগতির বিখ্যাত মহিষা দই উৎপাদিত হয় বছরে প্রায় তিন হাজার ৫০৪ টন। শুধু দুধ আর দইয়ের বাজারই ৬০০ কোটি টাকার বেশি। এর বাইরে রয়েছে মহিষ বিক্রি এবং লালন-পালনে জড়িত সাড়ে চারশ মানুষের জীবিকা।
চরের জমিতে মূলত ধান চাষ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন বাসিন্দারা। কেউ কেউ কিছু গরু-মহিষও লালন-পালন করেন। রামগতির চর গজরিয়া ও মৌলভীর চরের চিত্র এমনই। কিন্তু লম্বাখালী, চর আবদুল্যাহ ও নতুন চরের দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন। সেখানে মহিষ পালন একটি লাভজনক খাত হিসেবে গড়ে উঠেছে। এ তিন চরে আট হাজার মহিষ ও ভেড়া এবং কয়েকশ গরু-ছাগল রয়েছে। চরগুলো থেকে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ টন মহিষের দুধ উৎপাদন হয়। তা দিয়েই তৈরি হয় রামগতির ঐতিহ্যবাহী মহিষা দই। মহিষ পালনের মধ্য দিয়ে চরগুলোর জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি শক্ত ভিত পেয়েছে।
লম্বাখালী ও চর আবদুল্যাহর অবস্থান চর আবদুল্যাহ ইউনিয়নে এবং নতুন চর বড়খেরী ইউনিয়নে। রামগতি সদর থেকে ট্রলারে চর আবদুল্যাহ যেতে সময় লাগে ৩০-৪০ মিনিট। নতুন চরে যেতে প্রায় আধাঘণ্টা। প্রত্যন্ত এই চরগুলোর ওপর গোটা উপজেলার অর্থনীতিও এখন অনেকটা নির্ভরশীল।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর জানায়–লম্বাখালী, চর আবদুল্যাহ ও নতুন চরের মহিষের দুধ বছরে বিক্রি হয় প্রায় ২৮২ কোটি ৮০ লাখ টাকার। দই বিক্রি হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার। সাধারণত প্রতি লিটার দুধ ৮০ টাকা এবং দই ১ লিটার ২৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল থেকে জানা যায়, রামগতির বিভিন্ন চরে রয়েছে ছয় হাজার ২৯০টি মহিষ। দুধ দেওয়া মহিষ চার হাজার ৮১৩টি। এর মধ্যে ওই তিন চরেই মহিষ সাড়ে চার হাজারের বেশি। মহিষ লালন-পালনের ৮০ শতাংশই হয় লম্বাখালী, চর আবদুল্যাহ ও নতুন চরে, বাকিটা লোকালয়ে। এসব চরে সাড়ে চারশ লোক মহিষ পালন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের মধ্যে কেউ নিজের মহিষ লালন-পালন করেন, কেউ আবার বর্গা হিসেবে অন্যের মহিষ চরান। রয়েছেন রাখাল (বাথাইন্না) ও শ্রমিক।
এ উপজেলায় ১৫৭ খামারি আছেন। তাদের মধ্যে ৪৬ খামারি মহিষ পালনের মাধ্যমে খুবই ভালো অবস্থায় আছেন। তাদের সবাই ওই তিন চরে মহিষ পালন করেন। স্থানীয়রা জানান, চরগুলোতে মহিষগুলোর মালিক রয়েছেন ১৫-২০ শতাংশ। বাকিরা বর্গা পালনকারী। চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সেলিম ও মো. দিদার কয়েকশ মহিষের মালিক। তারা জানান, তাদের মহিষগুলো চরের বর্গাদারের কাছে দিয়েছেন। তারা মূলত মহিষ কিনে চরে পালতে দেন। পালনকারী খাইয়ে বড় করেন এবং দুধ দুইয়ে বিক্রি করেন। মালিক ও পালনকারী দুধ বিক্রির লভ্যাংশ ভাগ করে নেন। মহিষ বিক্রির পর ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে লাভের অংশ সমানভাবে ভাগ করে নেন। এ চরে এমন মালিকই বেশি। একেকজন বড় খামারি বছরে ২২-২৩ লাখ টাকা আয় করেন।
আবদুল্যাহ চরের একটি বাথানের মালিক নুরনবী মীর জানান, তিনি ২৫ বছর ধরে এ চরে মহিষ পালন করছেন। প্রথমে পাঁচটি মহিষ দিয়ে চরে এ খামার শুরু করেছিলেন। বর্তমানে আবদুল্যাহ চরে তাঁর ১২৫টি মহিষ আছে। রয়েছে আট শতাধিক ভেড়া। তাঁর খামারে কাজ করছেন আট শ্রমিক। তিনি জানান, বড়খেরীর নতুন চরে আড়াই হাজারের বেশি মহিষসহ রামগতির ওই তিন চরে সাড়ে চার হাজারের বেশি মহিষ রয়েছে।
আরেকটি বাথানের মালিক মো. লোকমান বলেন, ‘আবদুল্যাহর চরে বর্তমানে আমার ৪৩২টি মহিষ আছে। শীতের প্রথম দিক হওয়ায় এখন দুধ উৎপাদন কম। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছয় মণ করে দুধ পাচ্ছি। পাশাপাশি অনেক লোকের কর্মসংস্থানও হয়েছে আমার খামারে। এ ছাড়া বছরে কয়েকবার মহিষ কেনাবেচা করি।’
বাথান মালিক আবুল কাশেম বলেন, ‘আমার শতাধিক মহিষ রয়েছে। প্রতিদিন দুধ বিক্রি করি। সম্প্রতি মহিষের এক জোড়া বাছুর বিক্রি করেছি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। বড় মহিষ আকারভেদে বিক্রি হয় এক-দুই লাখ টাকায়।’
বাথান মালিক ফেরদৌস জানান, এমনিতে একটি মহিষে দিনে চার-পাঁচ লিটার দুধ হয়। ঘাসের সংকট থাকলে দুধ কমে যায়। চরগুলোতে যদি অর্ধেকটা ফসলের জন্য ও বাকিটা মহিষের চারণভূমি হিসেবে রাখা যায়, তাহলে আর সমস্যা থাকবে না।
রামগতি বাজারের দই ব্যবসায়ী শিশু দে, সজল সাহা ও তারক নাথ জানান, বহু বছর ধরে ওই চরগুলো তাদের মহিষের দুধের চাহিদা মেটায়। চর আলেকজান্ডার বাজারের মহিষের দুধ বিক্রেতা বিক্রম সাহা বলেন, ‘প্রতিদিন দুর্গম চর থেকে কয়েক মণ মহিষের দুধ আসে আমার গদিতে। এ জন্য আমি খামারিদের দাদন (অগ্রিম টাকা) দিয়ে থাকি। এই দুধ উপজেলার বিভিন্ন বাজারে দই ব্যবসায়ীদের কাছে পাঠানো হয়। এ উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী উপজেলা সুবর্ণচর ও নোয়াখালী সদরেও পাঠানো হয়।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. রুবেল সরকার বলেন, চরগুলো মহিষের দুধ উৎপাদন ও মাংসের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি হয় এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মহিষা দই। মহিষা দই না দেওয়ার কারণে এখানকার বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঝগড়া-মারামারির ঘটনার কথাও শুনেছি।
তিনি আরও বলেন, এ উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ৮ থেকে ১০ টন মহিষের দুধ উৎপাদন হয়। গত মাসে মহিষের দুধ উৎপাদন হয়েছে ৩৬০ টন। বছরে প্রায় চার হাজার ৩৮০ টন মহিষের দুধ উৎপাদন হয় এ অঞ্চলে। বছরে প্রায় তিন হাজার ৫০৪ টন মহিষা দই উৎপাদিত হয়। সূত্র: সমকাল


