বছরের শুরুতে শীতের সকালে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয় এক অনাবিল আনন্দ। দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে বছরের প্রথম দিনে নতুন বই তুলে দেওয়ার এই কার্যক্রম চালু হয়েছে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু এবারের অব্যবস্থাপনার কারণে বছরের শুরুতে সব শিক্ষার্থীরা বই পাবে কি না- এ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, নতুন বছরের শুরুতে এবার প্রাথমিকের ৮ কোটি ৫৯ লাখ ২৪ হাজার ৮৫৪ কপি বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে তৎপর রয়েছেন এনসিটিবির উৎপাদন ও বিতরণ শাখার কর্মকর্তারা। গত বুধবার পর্যন্ত প্রাথমিকের ৮৮ শতাংশ বই জেলা উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। বাকি ১২ শতাংশ বইয়ের মধ্যে প্রি ডেলিভারি ইন্সপেকশনও (পিডিআই) সম্পন্ন হওয়ার পথে। অবশ্য প্রাক-প্রাথমিকের প্রায় ৯৭ ভাগ বই ইতোমধ্যে ছাপা ও সরবরাহও সম্পন্ন হয়েছে। এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মুহাম্মদ আবু নাসের টুকু জানিয়েছেন, প্রাথমিকের বই মুদ্রণ ও পিডিআই’র যে গতি এই গতিধারা অব্যাহত থাকলে দ্রুত শতভাগ মুদ্রণ ও বিতরণ শেষ করা সম্ভব হবে।
অন্য দিকে মাধ্যমিকের ২১ কোটি পাঠ্যবই মুদ্রণ নিয়ে এখনো শঙ্কা কাটেনি। বই মুদ্রণের জন্য টেন্ডারে কাজ পাওয়া প্রেসগুলোকে তাগিদ দিয়েও তাদেরকে চুক্তি করানো যাচ্ছে না। এনসিটিবির বিতরণ শাখা থেকে জানা যায়, এখন শুধুমাত্র নবম শ্রেণী ছাড়া অন্যান্য শ্রেণীর বই মুদ্রণে গতিও শ্লথ। বিশেষ করে ষষ্ঠ সপ্তম এবং অষ্টম শ্রেণীর পাঠ্যবই মুদ্রণে কোনো কাজই শুরু হয়নি। সবগুলো প্রেস এখন নবম শ্রেণীর বই মুদ্রণ নিয়ে ব্যস্ততা দেখাচ্ছে। যদিও নবম শ্রেণীর ২২১টি লটের কাজ পেয়েছে মোট ৯৭টি প্রেস।
সূত্র আরো জানায়, ষষ্ঠ শ্রেণীর ৯৮টি লটের বই মুদ্রণের কাজ পেয়েছে ২৪টি প্রেস। এই ২৪টি প্রেসের মধ্যে মাত্র ৯টি প্রেস গত বুধবার পর্যন্ত চুক্তি করেছে। বাকি ১৫টি প্রেস চুক্তি করতে গড়িমসি করছে। সপ্তম শ্রেণীর ১০০ লটের কাজ পেয়েছে ৩১টি প্রেস। এর মধ্যে এখনো চুক্তি করেনি ১৩টি প্রেস। অষ্টম শ্রেণীর ১০০ লটের বইয়ের কাজ পেয়েছে ৩৮টি প্রেস। গত বুধবার পর্যন্ত মাত্র ৫টি প্রেস চুক্তি করেছে বাকি ৩৩টি প্রেসকে তাগিদ দেয়ার পরও তারা চুক্তি করেনি।
এ বিষয়ে গত বুধবার এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান পাঠান এই প্রতিবেককে জানান, দেরিতে হলেও সব প্রেস মালিক এই চুক্তি করবেন। যদিও এখন তারা নবম শ্রেণীর বই মুদ্রণে ব্যস্ত আছেন। তবে আগামী ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সবাইকেই চুক্তি করতে হবে। এই ডেড লাইন তাদেরকে জানিয়েও দেয়া হয়েছে। আর চুক্তি সম্পাদনের ৩০ দিনের মধ্যে প্রেস মালিকদের শতভাগ বই মুদ্রণ শেষে পিডিআই এবং সরবরাহ শেষ করতে হবে। সেই হিসাবে ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই সব বই মুদ্রণ শেষ হবে বলেও এই কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আর নতুন বছরের শুরুতে সব শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছে দেয়াও সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।
সূত্র জানায়, বই ছাপার কাজে যুক্ত প্রেসগুলো সাধারণত ডিসেম্বরজুড়ে নোট-গাইড ছাপতে ব্যস্ত থাকে। এ সময় বই বাঁধাইকারক পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অ্যাসাইনমেন্টের (ছাপার অনুমতি) বিপরীতে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া, উপজেলায় সরবরাহের পর দ্রুত বিল পরিশোধ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ- এসব বিষয়েও সমস্যা আছে বলে জানিয়েছেন প্রেস মালিকরা। এসব শর্ত বাস্তবায়ন করাও একটি বড় ফ্যাক্টর। ফলে এত সব জটিলতার কারণে নতুন বছরের প্রথম দিন মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো নিয়ে অনিশ্চয়তা ঘনীভূত হয়েছে।
জানা যায়, মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ৩০০ কপি বই ছাপার। উপজেলায় পৌঁছেছে মাত্র ৩ শতাংশ বই। এছাড়া মাদ্রাসার ইবতেদায়ি (প্রথমণ্ডপঞ্চম) স্তরের ৩ কোটি ১১ লাখের বেশি বইও এই পর্যায়েই ছাপা হয়। ইবতেদায়ি স্তরের ৫০টি লটের বই ছাপার দায়িত্ব পেয়েছে ৩৪টি প্রেস। এখন পর্যন্ত ছাপা ও বাঁধাইসহ মোট অগ্রগতি ৫৬ শতাংশ, পিডিআই হয়েছে ৩৩ শতাংশ, আর উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহ হয়েছে মাত্র ২০.৪৬ শতাংশ।
মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, ‘এনসিটিবি আগেভাগেই কাজ শুরু করেছিল, কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দেরি হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ না পেলে প্রেস কাজ শুরু করতে পারে না। পেপার মিল টাকা না পেলে কাগজ সরবরাহ সম্ভব নয়। সব মিলিয়ে সময়মতো বই দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।’
এনসিটিবির নতুন চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বলেন, ‘নির্দিষ্ট সময়ে বই পৌঁছে দিতে শিক্ষা উপদেষ্টার নেতৃত্বে আমরা চেষ্টা করছি। প্রেসগুলো তাদের সমস্যার কথা জানিয়েছে।’
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বিনা মূল্যের বই মুদ্রণ সময়মতো শেষ হবে কি না- এখনও অনিশ্চিত। একাধিকবার তাগাদার পরও গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অধিকাংশ প্রেস মালিক চুক্তি করেননি। ফলে মাধ্যমিকের ২১ কোটি বই জানুয়ারির আগে মুদ্রণ ও বিতরণ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক প্রেস মালিক সময়ক্ষেপণ করে নিম্নমানের কাগজ ব্যবহার করতে আগ্রহী বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরইমধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপায় নিম্নমানের কাগজ উদ্ধার হওয়ায় কর্তৃপক্ষ সতর্ক। তাই মাধ্যমিকের বই ছাপায় একই ঝুঁকি দেখা দিলেও মনিটরিং টিম সতর্ক নজরদারিতে আছে।
এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মতিউর রহমান পাঠান জানান, ৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সব প্রেস মালিককে চুক্তি করতে হবে এবং চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে শতভাগ বই মুদ্রণ, পিডিআই ও সরবরাহ সম্পন্ন করতে হবে। তার মতে, সময়মতো কাজ শেষ হলে নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছানো সম্ভব।
এনসিটিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস. এম. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘নিজেদের তদারকির পাশাপাশি পিডিআই টিম ও মাধ্যমিক-উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিশেষ মনিটরিং টিম মাঠে কাজ করছে। মালিকরা কিছু কাঠামোগত জটিলতার কথা জানিয়েছেন, যা সমাধান করা গেলে প্রক্রিয়া দ্রুত হবে।’
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়া হবে। বহু বই এরইমধ্যে গুদামে জমা হচ্ছে। নভেম্বরের মধ্যেই সব বই পেয়ে যাওয়ার আশা করছি। নির্বাচনের আগেই বিতরণ করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থা রাতারাতি বদলায় না। ধীরে ধীরে ধারাবাহিকভাবে কাজ চালালে ফল মিলবে। সমস্যা চিহ্নিত করে কাজ শুরু হয়েছে। যদি ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, পাঁচ বছরের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষার চেহারা বদলে যাবে।’


