মাশরুম বর্তমানে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে উচ্চমূল্যের পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়। কম জায়গা, স্বল্প সময়ে এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে উৎপাদনের সুযোগ থাকায় মাশরুম চাষ আধুনিক কৃষির একটি লাভজনক শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে আজকাল নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (Controlled Environment) উন্নত সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাশরুম চাষ করা হচ্ছে, যা উৎপাদন ও গুণগত মান দুটোই বৃদ্ধি করছে।
২. মাশরুমের বৈজ্ঞানিক পরিচিতি ও প্রকারভেদ
মাশরুম হলো ছত্রাকজাতীয় উদ্ভিদ, যার বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস—
- Kingdom: Fungi
- Phylum: Basidiomycota / Ascomycota
- Common Cultivable Mushrooms:
- অয়েস্টার মাশরুম (Pleurotus ostreatus)
- বাটন মাশরুম (Agaricus bisporus)
- মিল্কি মাশরুম
- শিটাকে মাশরুম
এসব প্রজাতির মধ্যে অয়েস্টার ও বাটন মাশরুম আধুনিক পদ্ধতিতে সবচেয়ে বেশি চাষ হয়।
৩. আধুনিক পদ্ধতিতে মাশরুম চাষের ধাপসমূহ
নীচের প্রতিটি ধাপের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
৩.১. স্পন (Spawn) উৎপাদন

স্পন হলো মাশরুমের বীজ। আধুনিক স্পন উৎপাদনে—
- HEPA ফিল্টারযুক্ত ল্যামিনার ফ্লো,
- অটোক্লেভ,
- ইনকিউবেটর,
- স্টেরাইল পেট্রি-ডিশ
ব্যবহার করে সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়।
এভাবে মানসম্মত স্পন উৎপাদিত হলে মাশরুম দ্রুত বাড়ে এবং রোগ কম হয়।
৩.২. সাবস্ট্রেট প্রস্তুত
সাবস্ট্রেট বা চাষের মাধ্যম মূলত খড়, গমের তুষ, কাঠের গুঁড়া বা কৃষিজীবাশ্ম দিয়ে তৈরি। আধুনিক উপায়ে—
- মেশিনে কুচানো খড়
- পাস্তুরাইজেশন চেম্বার
- আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
ব্যবহার করে সাবস্ট্রেট জীবাণুমুক্ত করা হয়।
৩.৩. ব্যাগ প্রস্তুত ও ইনোকুলেশন
সাবস্ট্রেটে স্পন মিশিয়ে বিশেষ প্লাস্টিক ব্যাগে ভর্তি করা হয়। ব্যাগে নির্দিষ্ট আকারে ছিদ্র রাখা হয় এবং—
- পুরো প্রক্রিয়াটি স্টেরাইল চেম্বারে
- গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করে
- তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে
সম্পন্ন করা হয়।
৩.৪. ইনকিউবেশন (Spawn running period)
ব্যাগগুলো অন্ধকার ঘরে ২৫–২৮°C তাপমাত্রায় রাখা হয়।
এ সময় মাইসেলিয়াম সাদা সুতার মতো পুরো ব্যাগ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
স্বয়ংক্রিয় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Humidifier + Thermostat) ব্যবহার করে ঘরের পরিবেশ আদর্শ রাখা হয়।
৩.৫. ফলধারণ কক্ষ (Fruiting Room)


ইনকিউবেশন শেষ হলে ব্যাগগুলো আলো, বাতাস চলাচল এবং আদ্রতা নিয়ন্ত্রিত ফলধারণ কক্ষে স্থানান্তর করা হয়।
আধুনিক fruiting room-এ থাকে—
- কুয়াশা তৈরির ফগার মেশিন
- ৮০–৯০% আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ
- ২০–২৫°C তাপমাত্রা
- CO₂ সেন্সরযুক্ত ভেন্টিলেশন
- LED গ্রো-লাইট
এতে মাশরুম দ্রুত বৃদ্ধি পায়, আকার বড় হয় এবং ফলনের পরিমাণও বেড়ে যায়।
৪. আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের ব্যবহার
১. ক্লাইমেট কন্ট্রোল ইউনিট: তাপমাত্রা-আর্দ্রতা অটোমেটিক নিয়ন্ত্রণ
২. অটোক্লেভ ও স্টেরিলাইজার: স্পন ও সাবস্ট্রেট জীবাণুমুক্তকরণ
৩. র্যাক সিস্টেম: অল্প জায়গায় বেশি ব্যাগ রাখার সুবিধা
৪. CO₂ ও আর্দ্রতা সেন্সর: পরিবেশ মনিটরিং
৫. ডিজিটাল ডাটা লগার: উৎপাদন তথ্য সংরক্ষণ
৬. আইওটি-ভিত্তিক স্মার্ট ফার্মিং: মোবাইল থেকে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ
৫. ফলন ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
অয়েস্টার মাশরুমের ক্ষেত্রে প্রতি ১ কেজি সাবস্ট্রেট থেকে ২৫০–৩০০ গ্রাম মাশরুম পাওয়া যায়।
- আধুনিক পদ্ধতিতে ফলন ৩০–৪০% পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব।
- একটি ছোট মাশরুম শেড থেকে মাসে ৫০–১০০ কেজি পর্যন্ত উৎপাদন সম্ভব।
- বাজারে মাশরুমের মূল্য সাধারণত বেশি হওয়ায় এটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে বিবেচিত।
- কম জায়গায় (একটি কক্ষেই) উচ্চ উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় শহর-গ্রামে সমানভাবে জনপ্রিয়।
৬. স্বাস্থ্য ও পুষ্টিমূল্যমাশরুম হলো—
- কম ক্যালরিযুক্ত
- উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ
- ভিটামিন বি, ডি, সেলেনিয়াম, পটাশিয়াম সমৃদ্ধ
যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শরীরকে শক্তি যোগায় এবং ডায়াবেটিস বা হৃদরোগীদের জন্যও উপযোগী।
৭. চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
চ্যালেঞ্জ
- তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে জটিলতা
- মানসম্পন্ন স্পনের অভাব
- ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ
- বাজারজাতকরণে বাধা
করণীয়
- প্রশিক্ষণ ও আধুনিক ল্যাব স্থাপন
- কৃষকদের জন্য সাবসিডি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা
- কোল্ড-চেইন ব্যবস্থার উন্নতি
- আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির সুযোগ বৃদ্ধি
আধুনিক পদ্ধতিতে মাশরুম চাষ বাংলাদেশের কৃষি ও উদ্যোক্তা খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনায় অল্প জায়গায় উচ্চ ফলন পাওয়া যায় এবং খুব দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব। তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এটি একটি লাভজনক, টেকসই এবং স্বাস্থ্যসম্মত কৃষি উদ্যোগ।


