বাংলাদেশে কয়েক বছর ধরে বাড়ছে স্ট্রবেরি চাষের জনপ্রিয়তা। আগে যে ফলটি একসময় শুধু শীতপ্রধান দেশের জন্য ভাবা হতো, এখন তা দেশের উত্তরের জেলা থেকে দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চল পর্যন্ত সফলভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামান্য উদ্যোগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে স্ট্রবেরি হতে পারে কৃষকের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি নগদ ফসল।

চাষে সফলতার গল্প
রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা এবং সিলেটসহ অনেক এলাকায় স্ট্রবেরি চাষ ক্রমেই বিস্তার লাভ করছে। মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, মাত্র ২০–২৫ শতাংশ জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করে কৃষকরা মৌসুমে ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনায় দ্রুত বর্ধনশীল শহুরে বাজারগুলোতে তাজা স্ট্রবেরির চাহিদা বাড়ায় কৃষকরা আরও আগ্রহী হচ্ছেন।
একজন সফল কৃষকের ভাষায়
“আগে শুধু সবজি করতাম, লাভ ছিল কম। এখন স্ট্রবেরিতে খরচ কম, দাম বেশি, সিজন শুরু হলে মাঠ থেকেই ক্রেতারা নিয়ে যায়।”
উৎপাদন বাড়ছে, প্রযুক্তির ব্যবহারও বৃদ্ধি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে অভিযোজন পরীক্ষায় দেখা গেছে যে বাংলাদেশের শীতকালীন আবহাওয়া স্ট্রবেরি চাষের জন্য বেশ উপযোগী।
অনেক কৃষক এখন ব্যবহারে আনছেন
- মালচিং
- ড্রিপ সেচ পদ্ধতি
- উন্নত জাতের চারা
- প্লাস্টিক টানেল বা গ্রীনহাউস প্রযুক্তি
এসব প্রয়োগে ফলন ২০–৩০% পর্যন্ত বাড়ছে বলে জানা গেছে।
বাজারে লাভজনক মূল্য ও বাড়তি চাহিদা

বাংলাদেশের বাজারে প্রতি কেজি স্ট্রবেরি ৫০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা কৃষকদের জন্য নিশ্চিত মুনাফা এনে দিচ্ছে।
হোটেল, বেকারি, আইসক্রিম ও জুস শিল্পে ব্যবহারের জন্য সারা বছরই স্ট্রবেরির চাহিদা থাকে। স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় আমদানি নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে বলে জানান কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
চ্যালেঞ্জও রয়েছে
যদিও লাভজনক, তবু স্ট্রবেরি চাষে কিছু সমস্যাও রয়েছে।
- ফুল ও ফল থাকাকালে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি বেশি
- অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে গাছের নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা
- ঠাণ্ডা আবহাওয়া না থাকলে ফলন কমে যায়
- বাজার ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ চেইনের ঘাটতি
তবে কৃষি বিভাগের দাবি, প্রশিক্ষণ, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি এবং রোগ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্রবেরি বাংলাদেশের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবনার সূচনা করেছে। সঠিক পরিকল্পনা, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানিযোগ্য গুণমান বজায় রাখা গেলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে স্ট্রবেরি একটি বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
লোকাল বাজারের পাশাপাশি নিকটবর্তী দেশগুলোতে রপ্তানিরও সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি কৃষি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান চাষিদের কাছ থেকে ফল সংগ্রহ করে প্রসেসড পণ্য তৈরি করছে—জ্যাম, জুস, শুকনো স্ট্রবেরি ইত্যাদি।
বাংলাদেশের কৃষিতে স্ট্রবেরি এখন একটি নতুন আলো। তরুণ উদ্যোক্তা, পড়াশোনা শেষে কৃষিতে ঝুঁকে পড়া যুবক এবং অভিজ্ঞ কৃষক, সবাই মিলে স্ট্রবেরিকে এগিয়ে নিচ্ছেন। যথাযথ সহায়তা ও প্রযুক্তি ব্যবহারে স্ট্রবেরি চাষ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে—এমনটাই আশা করছে সংশ্লিষ্ট মহল।


