বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে দেশীয় জাতের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। কম খরচে পালন, দ্রুত বংশবৃদ্ধি এবং উচ্চ বাজারমূল্যের কারণে দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা এখন বেশি ঝুঁকছেন এই জাতের ছাগল পালনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিকায়ন হলে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ প্রাণিসম্পদ শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।

উৎপাদন ও লাভজনকতায় নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) জানিয়েছে, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল বছরে দুইবার বাচ্চা দেয় এবং প্রতিবার ১–৩টি বাচ্চা জন্মানো সাধারণ বিষয়। কম খাদ্যে দ্রুত ওজন বাড়া এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় খামারিরা তুলনামূলক কম খরচে ভালো লাভ তুলতে পারছেন।
কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, রংপুর, ফরিদপুরসহ দেশের নানা জেলায় ঘুরে দেখা গেছে, ছোট খামারিরা বছরে ৮০ হাজার থেকে ৫–৮ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। একই সঙ্গে বড় বাণিজ্যিক খামারগুলো বছরে ২০ লাখ টাকারও বেশি লাভ করছে বলে জানা গেছে।
মাংস ও চামড়ার প্রতি বাজারে বাড়তি চাহিদা
বাংলাদেশে ছাগলের মাংস সবসময় জনপ্রিয়; বিশেষ করে কোরবানির বাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গলের দাম থাকে অন্যান্য জাতের তুলনায় বেশি। এর পাশাপাশি ব্ল্যাক বেঙ্গলের চামড়া আন্তর্জাতিক বাজারেও উচ্চমানের হিসেবে বিবেচিত—হালকা, টেকসই এবং বিলাসবহুল পণ্যে ব্যবহারের জন্য বিশ্বে সমাদৃত।
চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্টদের দাবি, মানসম্মত ব্ল্যাক বেঙ্গল চামড়া রপ্তানির মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরও সুযোগ তৈরি হতে পারে, যদি খামারগুলোকে আধুনিক ও রোগমুক্তভাবে গড়ে তোলা যায়।
গবেষণা ও উন্নয়নে এগিয়ে বাংলাদেশ
বিএলআরআই, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিভিন্ন এনজিও গত কয়েক বছর ধরে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের উন্নত জাত গঠনে কাজ করছে। কৃত্রিম প্রজনন (AI), রোগ প্রতিরোধ টিকা এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কারণে ছাগলের উৎপাদনশীলতা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
গবেষকদের দাবি, উন্নত প্রজনন প্রযুক্তি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনে খামারির আয় আরও ৩০–৪০ শতাংশ বাড়তে পারে।
নারী ও গ্রামীণ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা


গ্রামীণ নারীদের মধ্যে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালন বিশেষভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। নারীরা ঘরের পাশেই ছাগল পালন করতে পারেন এবং কম সময়ের মধ্যেই বাচ্চা বিক্রি বা মাংস বিক্রি করে আয় করতে পারেন।
সরকারের যুব উন্নয়ন প্রকল্প, এনজিও ঋণ সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ফলে হাজারো নারী এখন স্বাবলম্বী। বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য হ্রাসে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল সবচেয়ে কার্যকর প্রাণিসম্পদ উদ্যোগগুলোর একটি।
রপ্তানিতে সম্ভাবনার হাতছানি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের আধুনিক খামারগুলো যদি আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল এবং এর চামড়ার ব্যাপক রপ্তানি সম্ভব। এতে দেশের রাজস্ব ও কর্মসংস্থান দুই ক্ষেত্রেই বড় অবদান রাখবে এই জাতটি।
দেশীয় জাতের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল এখন শুধু গ্রামীণ পরিবারের সম্পদ নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন, রপ্তানি সম্ভাবনা এবং প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠছে। খামারি, গবেষক ও সরকারি সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল দেশের অন্যতম বড় সফল শিল্পে পরিণত হবে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


