শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

কুল চাষে বদলে যাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য—বাজারে উজ্জ্বল বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

শেয়ার করুন

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কুল বা বড়ই চাষ এখন আর শুধু আঙিনায় সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা, উন্নত জাত এবং লাভজনক বাজারমূল্যের কারণে এ ফলটি দ্রুতই বাণিজ্যিক ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন—সঠিক পরিকল্পনা থাকলে কুল চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

উন্নত জাত এসেছে, ফলন বেড়েছে কয়েকগুণ

গত এক দশকে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বারি কুল–১, বারি কুল–২, আপেল কুল, বাউ কুলসহ একাধিক উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের বিশেষ সুবিধা হলো—

  • ফল বড় ও আকর্ষণীয়
  • রোগবালাই তুলনামূলক কম
  • গাছ কম জায়গায়ও ফলন দেয়
  • বাজারে দাম ভালো পাওয়া যায়

কুল বাগান করলে একবার রোপণের পর ১২–১৫ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়, যা কৃষকদের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী আয় নিশ্চিত করে।

কম খরচ, নিশ্চিত মুনাফা

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, এক বিঘা কুল বাগান করতে প্রথম বছর কিছুটা খরচ বেশি হলেও পরের বছরগুলোতে খরচ কমে যায়।
গড় হিসাব অনুযায়ী—

  • প্রতি বিঘা খরচ: প্রথম বছর ৩০–৪০ হাজার টাকা
  • বার্ষিক আয়: ১–১.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত
  • লাভ: ব্যয় বাদ দিয়েও প্রতি বিঘায় ৭০–৯০ হাজার টাকা লাভ

ফলন বৃদ্ধির সঙ্গে বাজারে চাহিদা বাড়ায় এই লাভ বছরে বছরে আরও বাড়ছে।

দেশি বাজারে চাহিদা তুঙ্গে

শীত মৌসুমে কুল বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গে শহর-গ্রামে চাহিদা চোখে পড়ার মতো। দেশি কুল, আপেল কুল, বাউ কুল—সব ধরনের কুলেরই দাম ভালো থাকে। পুষ্টিগুণ ও স্বাদের কারণে স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের আগ্রহও বাড়ছে।
পাইকারি বাজারে কুলের বেচাকেনা এখন রীতিমতো মৌসুমি উৎসবের মতো।

রপ্তানির নতুন দিগন্ত

মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও ইউরোপে বাংলাদেশি কুলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।

  • আকর্ষণীয় রং
  • দাগ কম
  • দীর্ঘ সময় সতেজ থাকা

এসব কারণেই বিদেশি বাজারে কুলের আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি রপ্তানি প্রতিষ্ঠান কুলকে দেশে-বিদেশে ব্র্যান্ডিং করার উদ্যোগ নিয়েছে।

চাষাবাদে কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো আছে

যদিও কুল চাষ লাভজনক, তবু কিছু সমস্যা রয়েছে—

  • ফলমাছি ও ছত্রাকজনিত রোগের আক্রমণ
  • অতিবৃষ্টি হলে ফল ঝরে পড়া
  • বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীর আধিক্য

সরকারি কৃষি পরামর্শ, ফাঁদ ব্যবহার, জৈব সার ও সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনা (IPM) ব্যবহারে এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাগান করে বদলে যাচ্ছে কৃষকের জীবন

রাজশাহী, নাটোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় কুল চাষিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেক কৃষক জানাচ্ছেন—
“ধান করে যেখানে লাভ হতো না, সেখানে কুল বাগান করে পরিবার সচল হয়েছে। সন্তানের পড়াশোনা, ঘরবাড়ি—সবই এখন সম্ভব হচ্ছে কুল চাষের আয়ে।”

টেকসই আয়, রপ্তানির সম্ভাবনা, কম খরচ ও উচ্চ লাভের কারণে কুল বা বড়ই এখন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ফলফসল।
সঠিক প্রযুক্তি আর বাজার ব্যবস্থাপনা থাকলে এ ফল বাংলাদেশের কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় শক্তি হতে পারে।

সাম্প্রতিক খবর

এই বিভাগের আরও খবর