নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এখন বাংলাদেশের কৃষিখাতে বড় চ্যালেঞ্জ। শুধু উৎপাদন নয়, ফসলের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৮ সালের মধ্যে তিন লাখ হেক্টর জমিকে গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) বা উত্তম কৃষিচর্চার আওতায় আনতে উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্য পূরণে কৃষক থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত পুরো উৎপাদন ও বিপণন প্রক্রিয়ায় সুশৃঙ্খল মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ চলছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স (পার্টনার)’ প্রকল্প। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে গ্যাপভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ৭৫ হাজার হেক্টর জমিতে গ্যাপভিত্তিক চাষাবাদ চলছে। এর মধ্যে সবজির জন্য ৫০ হাজার হেক্টর এবং ফলের জন্য ২৫ হাজার হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, বগুড়া, রাজশাহী ও মুন্সীগঞ্জ—এই আটটি জেলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
সবজির মধ্যে আলুর জন্য ২০ হাজার হেক্টর, বেগুন, করলা, পেঁপে, কচুরলতি, বরবটি ও লাউ—প্রতিটির জন্য ৫ হাজার হেক্টর করে জমি বরাদ্দ রয়েছে। ফলের মধ্যে আম ১৫ হাজার, আনারস ২ হাজার, পেয়ারা ১ হাজার এবং লেবু ২ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন চলছে।
এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল’ নামে এক অনন্য শিক্ষাকেন্দ্র থেকে। প্রতিটি স্কুলে ২৫ জন কিষান-কিষানি অংশ নিচ্ছেন এবং প্রতি স্কুলের অধীনে ১০ হেক্টর জমিতে গ্যাপ নীতিতে চাষাবাদ চলছে। এখানে রাসায়নিক সার ব্যবহার কমানো, জৈব সার ও ফেরোমন ট্র্যাপ ব্যবহার, মাটি ও পানি সংরক্ষণসহ টেকসই কৃষিচর্চার নানা পদ্ধতি শেখানো হয়। ফসলের পরবর্তী পরিচর্যা ও বাজার ব্যবস্থাপনাও প্রশিক্ষণের অংশ। প্রশিক্ষণ শেষে কৃষকদের গ্যাপ সনদ দেওয়া হয় এবং স্থানীয় কৃষকসেবা কেন্দ্র থেকে তারা অন্য কৃষককে পরামর্শ দেন।
গত অর্থবছরে এই প্রকল্পের আওতায় ৩০০ একর জমিতে আম ও সবজি উৎপাদন হয়েছে, যার কিছু রপ্তানিও হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৮ জন কৃষক গ্যাপ সনদ পেয়েছেন। এই সনদ ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানির পথ উন্মুক্ত করবে।
রাজশাহীর তানোরের কৃষক হাফিজুল ইসলাম বলেন, “আগে কীটনাশক অনেক ব্যবহার করতাম। এখন ফেরোমন ট্র্যাপ আর জৈব সার ব্যবহার করি। ফলনও খারাপ না, বরং বাজারে দাম ভালো পাই।”
অন্যদিকে সাতক্ষীরা সদরের ওমরাপাড়া, বালিথা এবং কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগর এলাকার কয়েকশ আম চাষি, যেমন সোলাইমান মোড়ল, হেলাল উদ্দীন, সিরাজুল ইসলাম, গ্যাপ পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করে ভালো ফলন ও বেশি দাম পেয়েছেন। তাদের উৎপাদিত আম রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর কৃষকের বাজারে বিক্রির পাশাপাশি রপ্তানিও হয়েছে।
পার্টনার প্রকল্পের উপকর্মসূচি পরিচালক ড. মাহবুবা মুনমুন বলেন, “উত্তম কৃষিচর্চা মানে শুধু ফসল ফলানো নয়, বরং উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ ও পরিবহন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। এতে মাটি, পানি, রাসায়নিক ও শ্রমিকের স্বাস্থ্য—সব কিছুর ভারসাম্য রক্ষা হয়।”
প্রকল্পের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ জানান, “একটি ফসল গ্যাপ সার্টিফাইড হতে হলে নির্দিষ্ট কিছু পদ্ধতি মানতে হয়। আমরা কৃষকদের হাতে-কলমে সেই পদ্ধতি শেখাচ্ছি। আগামীতে ১০ লাখ কৃষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।”
বাংলাদেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ড. মনজুরুল ইসলাম বলেন, “ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশেই এখন গ্যাপ সনদ ছাড়া কৃষিপণ্য রপ্তানি করা যায় না। বাংলাদেশে গ্যাপভিত্তিক উৎপাদন বাড়লে ফল ও সবজির রপ্তানি বহুগুণে বাড়বে। এতে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশক ব্যবহারের অপচয়ও কমবে।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “ছোট কৃষকের কাছে এই চর্চা পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় নিরাপদ পণ্য উৎপাদন করেও কৃষক দাম পান না। সার্টিফিকেশন, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগের বিষয়গুলো সমন্বয় না হলে এই উদ্যোগ টেকসই হবে না।”


