শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

কৃষি কাজে নারীর অবদান: কৃষির অদৃশ্য বাহিনী

শেয়ার করুন

বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে কৃষি শ্রমের একটি বড় অংশ নারীদের দ্বারা সম্পন্ন হয়। তবে, বহু ক্ষেত্রে তাদের অবদান স্বীকৃত নয়, কিংবা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয় না। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে, নারীরা কৃষি কাজে অনিশ্চিত পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। কৃষি ও কৃষক পরিবারগুলোর অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছেন নারীরা, যদিও তারা অনেক সময় ‘অদৃশ্য’ থেকে যান।

নারীর শ্রম: কৃষি উৎপাদনে মূল অবদান

কৃষি কাজের ক্ষেত্রে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত ব্যাপক এবং বহুমুখী। তারা সাধারণত জমি চাষ, বীজ বপন, ফসল পরিচর্যা, সেচ ব্যবস্থা, ফল সংগ্রহ, খড় কাটা এবং ধান মাড়াইয়ের মতো বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত থাকে। যদিও পুরুষরা বেশি করে যান্ত্রিক কাজ যেমন ট্র্যাক্টর চালানো বা বড় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে থাকে, নারীরা বেশি করে হাতে কাজের মধ্যে জড়িত।

নারীরা কৃষির অপ্রকাশিত চিত্র। প্রায় ৬০% কৃষি কাজ নারীরা করেন। তারা মাঠে একাই বা দলবদ্ধভাবে বিভিন্ন ধরনের শস্য চাষের কাজ করেন, ফল সংগ্রহ করেন, বাজারে নিয়ে যান এবং পরিবারের জন্য খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করেন। তাছাড়া, মহিলারা সাধারণত খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি গোবর সার তৈরি, মাছ চাষ, মধু সংগ্রহ, হাঁস-মুরগি পালনও করেন—যা কৃষি থেকে বেরিয়ে অনেকাংশে পরিবার এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য কার্যকরী।

নারীরা: পারিবারিক কৃষির অগ্রদূত

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে, কৃষক পরিবারের নারীরা শুধু ক্ষেত খামারই সামলায় না, বরং তারা পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করে। দেশের বেশিরভাগ কৃষক পরিবারে মহিলারা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন। তারা শুধু শস্য উৎপাদন নয়, বরং সেগুলির সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং বাজারজাতকরণের কাজও করে থাকেন। যেমন, দুধ ও দুধজাত পণ্য, মিষ্টান্ন তৈরী, বিভিন্ন ধরনের সবজি সংরক্ষণ—এসব কাজের জন্যও তাদের অবদান অপরিসীম।

নারীদের জন্য কৃষি প্রযুক্তি: চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ

কৃষিতে নারীদের আরও অধিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার। বর্তমান সময়ের অনেক নারীকৃষক তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, উপকরণ, এবং কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে অনেক ভালো ফলাফল পাচ্ছেন। তবে, সমস্যা তৈরি হয় যখন কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার তাদের জন্য সহজলভ্য হয় না।

অথচ, যদি নারীরা কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য পেতেন, তবে তাদের উৎপাদনশীলতা আরও বৃদ্ধি পেত এবং একে তারা তাঁদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারতেন। নারী কৃষকদের জন্য আরও প্রশিক্ষণ, ঋণ সুবিধা, ও নারীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান কৃষি খাতে নারীর ভূমিকা আরও দৃঢ় করতে পারে।

নারীর ক্ষমতায়ন: কৃষিতে নারীর অধিক অংশগ্রহণের উপকারিতা

কৃষিতে নারীর ক্ষমতায়ন শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত উন্নয়নের জন্য নয়, বরং দেশীয় কৃষির উন্নতির জন্যও প্রয়োজনীয়। নারীরা যদি উৎপাদন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বাজারজাতকরণ, এবং প্রকল্প পরিকল্পনায় অধিক ভূমিকা রাখতে পারেন, তাহলে কৃষির সার্বিক উন্নতি সম্ভব। এমনকি, নারীরা নিজেদের আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবারে আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেন এবং আরও বেশি খাদ্য উৎপাদনে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন।

কৃষিতে নারীদের অংশগ্রহণ শুধু একদিকে লাভজনক নয়, বরং সামাজিক উন্নয়নেও সাহায্য করবে। কৃষিতে নারীদের এগিয়ে আসা দেশের সার্বিক উন্নতির লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যেহেতু নারী প্রধান কৃষক জনগণের বিশাল অংশ, তাই তাদের কার্যকরী ক্ষমতায়ন শুধু কৃষি নয়, সমাজের সকল স্তরে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

নারী কৃষকরা: বাস্তব উদাহরণ

বিভিন্ন অঞ্চলে নারীরা কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। এর মধ্যে কিছু নারী উদ্যোক্তা কৃষিতে উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়েছেন। যেমন, তারা নতুন ধরনের কৃষি উপকরণ তৈরি করছেন, উৎপাদন বৃদ্ধি করছে এবং সাশ্রয়ী দামে কৃষিপণ্য বাজারে নিয়ে আসছেন। এমনকি, তারা কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ নিয়ে আধুনিক কৃষির দিকে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ছেন।

কৃষির ক্ষেত্রেও নারীরা যে অবিচ্ছেদ্য অংশ, তা আজকের দিনে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাদের অবদান শুধুমাত্র শস্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তারা একটি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুস্থতা এবং সমৃদ্ধির অগ্রদূত। তবে, তাদের অবদানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন এবং সমর্থন করতে হলে, আমাদের আরও সচেতন হতে হবে এবং নারীদের জন্য কৃষিতে সুযোগ এবং সুবিধা আরও বাড়াতে হবে।

নারীদের কৃষিতে আরো বড় ভূমিকা দিতে হলে, তাদের অধিকার, সুযোগ এবং সম্পদে সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কেবল তাতে নয়, উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হলে, দেশের কৃষি খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হবে।

সাম্প্রতিক খবর

এই বিভাগের আরও খবর