শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

হারিয়ে যেতে বসা খেজুরগাছি

শেয়ার করুন

শীতের ভোরের কুয়াশা ভেদ করে গ্রামের আকাশে দোল খায় বাঁশের মই। তার ওপরে ঝুলে আছেন একজন মানুষ—যাঁকে আমরা বলি গাছি। খেজুরগাছের মাথায় উঠে রস সংগ্রহের এই পেশা এক সময় বাংলার গ্রামীণ জীবনের অন্যতম ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আজ এই পেশা হারিয়ে যেতে বসেছে।

অতীতের গৌরবময় দিনগুলো

একসময় বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে শীত মানেই ছিল খেজুরের রসের মৌসুম। সূর্য ওঠার আগেই হাঁড়ি ভর্তি টাটকা রস নিয়ে দরজায় দরজায় ফিরতেন গাছিরা। শীতের সকালের খেজুরের রস ছিল বাঙালি জীবনের পরিচিত রীতি। অনেক পরিবার নিজেরাই রস জ্বালিয়ে গুঁড় বানাত।

গাছিদের তখন সামাজিক মর্যাদা ছিল আলাদা।

  • তাঁরা পুরো গ্রামের গাছের দেখভাল করতেন
  • শীত আসার আগে প্রতিটি গাছের পরিষ্কার-পরিচর্যা করতেন
  • রসের মান ও স্বাদ ঠিক রাখতে গাছের যত্ন ছিল তাঁদের কাজের একটি বড় অংশ

গাছিদের দক্ষতা ছিল প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত। ছেলেরা বাবার সঙ্গে গাছ বেয়ে উঠে কাজ শিখত ছোটবেলা থেকেই।

বর্তমানের সংকট: কেন কমে যাচ্ছে গাছি?

https://www.researchgate.net/publication/326569395/figure/fig3/AS%3A651725979545600%401532394990007/a-In-Bangladesh-fresh-date-palm-sap-is-collected-by-shaving-the-date-palm-tree.png?utm_source=chatgpt.com
https://tds-images.thedailystar.net/sites/default/files/styles/very_big_201/public/images/2023/01/06/date-palm-trees.jpg?utm_source=chatgpt.com

আজ সেই পেশা টিকে থাকার লড়াই করছে। গ্রামের পথে হাঁটলে দেখা যায়—আগের মতো আর নেই গাছি, নেই সেই রস সংগ্রহের দৃশ্য।
এর কয়েকটি প্রধান কারণ—

১. খেজুরগাছের সংখ্যা কমে যাওয়া

আধুনিক কৃষিকাজে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে গিয়ে অনেক জায়গায় খেজুরগাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ফলে গাছি পেশার মূল ভিত্তিই সংকুচিত হয়েছে।

২. আর্থিক অনিশ্চয়তা

রস তোলা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, কিন্তু আয় তুলনামূলক কম। নতুন প্রজন্ম কম আয়ের এই পেশায় আগ্রহী নয়।

৩. নিসৃত রোগ ও পরিবেশগত পরিবর্তন

গাছের রোগবালাই, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং শীতের সময় স্বল্পতা রস উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

৪. সুস্বাস্থ্যহানির ঝুঁকি

গাছে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক গাছি দুর্ঘটনায় আহত বা বিকলাঙ্গ হয়ে পড়েন। এই ভয়ের কারণে অনেকেই পেশা ছাড়ছেন।

যে গাছি এখনো ধরে রেখেছেন ঐতিহ্য

বাংলার বিভিন্ন এলাকায় এখনো কিছু গাছি আছেন যারা নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করেন এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে।
তাঁদের মতে—

তবে তাদের কণ্ঠেও শোনা যায় দুশ্চিন্তা। রস সংগ্রহের মৌসুম ছোট হওয়ায় আয় কমে গেছে। অনেক গাছি আবার পাশাপাশিই কৃষিকাজ, নৌকাচালনা বা দিনমজুরির কাজ করে দিন কাটান।

ঐতিহ্য বাঁচাতে কী প্রয়োজন?

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলছেন—

  • খেজুরগাছ রোপণে সরকারি উদ্যোগ
  • গাছিদের সুরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ
  • খেজুর গুঁড়ের আধুনিক বাজারজাতকরণ
  • বিভিন্ন অঞ্চলে ‘গুর উৎসব’ বা শীতকালীন রসের পর্যটন উৎসাহ নেওয়া

এসব উদ্যোগ নিলে গাছি পেশাকে আবারও টেকসই করা সম্ভব হতে পারে।

খেজুরের রস বাঙালির সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আধুনিকতার ভিড়ে এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সামান্য উদ্যোগ ও যত্ন নিলেই এই হারিয়ে যাওয়া পেশা ফিরে পেতে পারে তার আগের জৌলুস।

গাছিরা আজও ভোরের কুয়াশায় গাছ বেয়ে ওঠেন—ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে।
তাদের হাতেই বেঁচে আছে শীতের স্বাদ, বাঙালির স্মৃতি।

সাম্প্রতিক খবর

এই বিভাগের আরও খবর