ঘন কুয়াশা, বৈরী আবহাওয়া আর অনিশ্চিত জলবায়ুর কারণে কৃষিকাজে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো বীজতলা ও চারা রোপণ। চারা টিকবে কি না, রোগবালাই কিংবা পশু-পাখির আক্রমণ হবে কি না এই উৎকণ্ঠা কৃষকের নিত্যসঙ্গী। তবে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই চিরচেনা দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমিয়ে এনেছে ‘পলিনেট হাউস’।
জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায় স্থাপিত একটি আধুনিক পলিনেট হাউস এখন স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী জেলার কৃষকদের কাছে ভরসার ঠিকানা হয়ে উঠেছে। এখান থেকে উন্নতমানের চারা সংগ্রহ করে উচ্চফলনশীল ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন লাভের পথ খুঁজে পাচ্ছেন কৃষকরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় প্রায় দুই বছর আগে আক্কেলপুর উপজেলার পশ্চিম মানিকপাড়া এলাকায় এই পলিনেট হাউস স্থাপন করা হয়। জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বছরব্যাপী নিরাপদ উচ্চমূল্য ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যেই নেওয়া হয় এ উদ্যোগ। এখানে ক্যাপসিকাম, টমেটো, ব্রোকলি, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মরিচ, বেগুনসহ নানা ধরনের সবজির চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। গুণগত মান ভালো হওয়ায় প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা ভিড় করছেন চারা সংগ্রহের জন্য।
উপজেলার ভিকনী গ্রামের কৃষক শহিদুল ইসলাম জানান, আগে এখান থেকে মরিচের চারা কিনে ভালো ফলন পেয়েছেন। এবার তিনি ‘গ্রিন বল’ জাতের বেগুন চারা কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে এখান থেকে ঝালের চারা নিছিলাম, গাছ ভালো হইছে, ভালো পয়সা পাইছি। তাই এবারও আসছি। এখন অনেকেই এখান থেকে চারা নিচ্ছে, আমিও এলাকায় গিয়ে সবাইকে বলি।’
প্রথমবারের মতো পলিনেট হাউস থেকে মরিচের চারা কিনতে এসেছেন কৃষক ফারুক আহম্মেদ। তিনি জানান, ৬ শতক জমিতে চাষের জন্য এক হাজার টাকায় ৫০০টি মরিচের চারা কিনেছেন। তিনি বলেন, ‘যদি ভালো ফলন পাই, তাহলে ভবিষ্যতে এখান থেকেই সব ধরনের চারা নেব।’
পলিনেট হাউসের পরিচর্যাকারী আবু রায়হান জানান, এখানে আধুনিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজির চারা পাওয়া যায়। চারা উৎপাদনে মাটির পরিবর্তে কোকোপিট ব্যবহার করা হয়। তিনি বলেন, ‘মাটির চারা অনেক সময় রোপণের পর নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু কোকোপিটের চারা প্রায় নষ্টই হয় না। ফলনও অনেক ভালো হয়।’
আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বলেন, এই পলিনেট হাউস থেকে আশপাশের কৃষকেরা সহজেই উন্নতমানের মৌসুমী সবজির চারা পাচ্ছেন। এসব চারা রোপণ করে কৃষকরা ভালো ফলন পাচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাকির হোসেন বলেন, এই অত্যাধুনিক পলিনেট হাউসে মূলত ক্যাপসিকাম, টমেটো, বেগুন, শসার মতো উচ্চমূল্যের ফসলের চারা উৎপাদন করা হয়। এখানে ড্রিপ ইরিগেশন ও মিস্ট ইরিগেশন পদ্ধতির মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয়, যা গাছের সঠিক বৃদ্ধিতে সহায়ক।
তিনি আরও বলেন, এই পলিনেট হাউসের অন্যতম বিশেষত্ব হল মাটিবিহীন বা ‘সয়েল-লেস’ চারা উৎপাদন ব্যবস্থা। কোকোপিটে উৎপাদিত চারার শিকড় শক্তিশালী হয় এবং রোপণের পর ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন শক প্রায় থাকে না। ফলে শতভাগ চারা টিকে যায় এবং দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাশ্রয়ী মূল্যে এই চারা সরবরাহের মাধ্যমে কৃষকদের ফলন ও আয় বাড়ছে, পাশাপাশি চারা উৎপাদনে যুক্ত মানুষের জীবনমানও উন্নত হচ্ছে।
শেয়ার করুন
সাম্প্রতিক খবর

