ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের নতুন হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে। নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে পাল্টে যাচ্ছে অতীতের সমীকরণ। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার প্রথম দিকে শতাধিক আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। তাঁরা ক্রমেই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করছেন।
এদিকে বিএনপির প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট শেষ দিকে এসে হোঁচট খেয়েছে। অন্যতম শরিক ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে ইসলামি দলগুলোর ভোট তিন ভাগে বিভক্ত হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামায়াতের জোট থেকে আরও কিছু দল বেরিয়ে যেতে পারে। ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জোট করার জন্যও কিছু দল যোগাযোগ করছে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোটের নাটকীয়তা চলতে থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি তাদের আন্দোলনের শরিক ইসলামপন্থি দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে চারটি আসনে ছাড় দিয়েছে। এই দলের নেতারা অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে হেফাজতের ভোট কোনো একক ইসলামি দল পাবে এ কথা বলা যায় না। জামায়াতে ইসলামীর জোটে গেল না ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, যারা ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আনার প্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকায় ছিল। উল্টো জামায়াতের আদর্শিক ও রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলে একাই ভোট করার ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরুর আগে জামায়াতের জোট থেকে ইসলামী আন্দোলন সরে আসায় ভোটের হিসাব কি পাল্টে যাচ্ছে? এমন প্রশ্ন সামনে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন এক জোটে থাকলে ভোটে যে প্রভাব পড়ত, তা এখন অনেকটাই কমে আসবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ভোটের মাঠে না থাকায় নির্বাচনে জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলোকে বিএনপির বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হচ্ছিল। বৃহস্পতিবার জামায়াত জোট নিজেদের মধ্যে ২৫৩ আসন ভাগাভাগির ঘোষণা দেয়। ইসলামী আন্দোলনের জন্য অপেক্ষা করার পরও তারা আসেনি। বাকি ৪৭ আসন নিয়ে সমঝোতা চূড়ান্ত না হওয়ার কথা বলা হয় জোটের তরফে। কয়েক মাসের টানাপোড়েনের পর বৃহস্পতিবার সবশেষ জোটের সমঝোতা বৈঠকেও যায়নি ইসলামী আন্দোলন।
ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, তাঁর দল ২৬৮ আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে। সেই সঙ্গে বাকি ৩২ আসনে অন্যদের সমর্থন দেবেন তাঁরা। এতে ইসলামপন্থিদের ভোট এক বাক্সে আসার সম্ভাবনা বিলীন হয়ে গেল। যার সূচনা হয়েছিল এক বছর আগে বরিশালের চরমোনাইয়ে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাতে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামায়াতের জোটে দলটি যোগ না দেওয়ায় সারা দেশের বেশ কিছু আসনে প্রভাব পড়বে। জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন করলে অন্তত শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ সৃষ্টি হতো। অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিএনপির বিকল্প শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তাতে ১৯৭৯ সালের পর প্রথমবারের মতো জামায়াতের সঙ্গে ইসলামপন্থি দলগুলোর সম্মিলিত নির্বাচনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এর আগে বিভিন্ন সময় অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য হলেও জামায়াতের সঙ্গে ইসলামপন্থি দলগুলোর স্বতন্ত্র জোট গড়ে ওঠেনি। ইসলামপন্থি দলগুলোর নির্বাচনি ঐক্য প্রক্রিয়া চলার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন নিয়ে কয়েকটি জরিপ হয়েছে, যেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর উত্থানের ইঙ্গিত রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত। একটি ধারা কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক ছাত্র-শিক্ষক, যাদের একটি বড় অংশ জামায়াতকে ভোট দেয় না। এই ধারার ভোটগুলো বিএনপিসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে যেতে পারে। দ্বিতীয় একটি অংশ যারা প্রধানত ইসলামী আন্দোলনকে ভোট দিতে পারে।
বিএনপির একজন নেতা বলেন, ইসলামি ভাবধারার একটি বড় অংশের ভোট বিএনপির দিকেই ঝুঁকে আছে। কেবল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের কথায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভোট জামায়াতের দিকে যাবে না।
এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস যে শেষ পর্যন্ত জামায়াতের জোটে থাকবে তা-ও বলা যাচ্ছে না। এদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে জোটে ফেরানোর জন্য ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাবে জামায়াত। নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে যে ‘১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ গড়ে উঠেছে, তার সূচনা ঘটে ধর্মভিত্তিক আট দলের যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে শুরু হয়েছিল সেই যুগপৎ আন্দোলন।
এ বিষয়ে ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করীম বলেন, ‘আমাদের কোনো অপেক্ষা নাই। ইসলামের পক্ষে যারা থাকবে, তাদের পক্ষে আমরা আছি।’
এ বিষয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জন্য ৪৭টি আসন রেখেছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট; কিন্তু দলটি জোটে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই আসনগুলো এখন জোটের দলগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি হবে। শুরু থেকে যে প্রক্রিয়ায় আসন বণ্টন হয়েছে, ইসলামী আন্দোলন না আসায় সমঝোতার ভিত্তিতে একই প্রক্রিয়ায় আসন বণ্টন হবে। যে আসনে যে দলের প্রার্থীকে সবচেয়ে শক্তিশালী মনে করা হবে, তাঁকেই একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হবে।


