মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর এলাকায় বরই চাষ করে গত ১৭ বছর ধরে সফলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আজাদুর রহমান। কোনো ধরনের কেমিক্যাল ব্যবহার ছাড়াই উৎপাদিত তার বাগানের বরই এখন স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ হচ্ছে। তার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে এলাকার অনেক যুবক এখন বরই চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
আজাদুর রহমান কমলগঞ্জ উপজেলার পতনউষার ইউনিয়নের শ্রীসূর্য নয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ওই গ্রামের মো. আব্দুল জব্বারের ছেলে। মাস্টার্স পাস করার পর চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি কৃষিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। বর্তমানে তার বাগানে থাই আপেল কুল, বাউকুল, জাম্বুকুল ও ঢাকা-৯০, টক মিষ্টি কুল, জাতের বরই চাষ হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৭ একর জমিতে গড়ে ওঠা বাগানের প্রতিটি গাছ ফলভারে নুয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঢাকা-৯০ জাতের বরইয়ে গাছগুলো ছেয়ে আছে। ফলের ভার সামলাতে প্রতিটি গাছে বাঁশের খুঁটি দিয়ে আগলে রাখা হয়েছে। পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে পুরো বাগানটি জাল দিয়ে ঘেরা। প্রতিদিন বরই সংগ্রহ ও বিক্রির কাজে মুসলিমসহ ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক কাজ করছেন।
আজাদুর রহমান জানান, ‘প্রতি বছর বরই ও ফুলগাছের চারায় প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি আয় করছেন ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমে ঢাকা-৯০ ও জাম্বু কুল জাতের বরই চাষ করে তিনি বেশি লাভবান হয়েছেন। বর্তমানে ঢাকা-৯০ ও জাম্বু কুল প্রতি কেজি ১০০ টাকা এবং বাউকুল ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিদিন তার বাগান থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি বরই সংগ্রহ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ৮ একর জমিতে বরই চাষ করতে প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ টাকার বরই বিক্রি করেছি। বাগানে আরও প্রায় ১০ লাখ টাকার বরই আছে। বরই চাষে অল্প সময়েই লাভবান হওয়া যায়। বরই বিক্রির পাশাপাশি কলম চারা তৈরি করি। বিভিন্ন ফল ও ফুলের চারাও বিক্রি করছি।’
বরই বাগান দেখতে আসা মৌলভীবাজার সদর থেকে আগত মামুন আহমেদ বলেন, ‘প্রতিদিন আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই বাগান দেখতে আসছেন। আমরাও ১০ কেজি বরই নিয়েছি। বরইগুলো খুবই সুস্বাদু। আজাদুর রহমান ভাই এই বাগান করে স্বাবলম্বী হয়েছেন, যা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।’
বরই কিনতে আসা স্থানীয় শিক্ষার্থী নাজমিন বলেন, ‘শমশেরনগর বিমান ঘাঁটি এলাকার বরই খুবই মজাদার। তাই অনেক দূর থেকে বরই কিনতে এসেছি। ৫শত টাকার বিনিময়ে প্রায় ৫ কেজি বরই নিয়েছি।’
কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষিবিদ জয়েন্ত কুমার রায় জানান, ‘চলতি মৌসুমে কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে বরই আবাদ হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণ ভালো হওয়ায় বরইয়ের ফলন ভালো হয়েছে। শমশেরনগরে আজাদুর রহমানের বাগানের বরই খুবই মিষ্টি ও সুস্বাদু। তার বাগান দেখে অনেক বেকার যুবক বরই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে কৃষকরা নিজেরাই ভালো জাত নির্বাচন করে রোপণ করছেন, ফলে ফলনও ভালো হচ্ছে। বরই চাষে আজাদুর রহমানের এই সাফল্য এখন শুধু একটি বাগানের গল্প নয়; এটি হয়ে উঠেছে কমলগঞ্জের কৃষি সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
এদিকে, অষ্টেলিয়ান বল সুন্দরী আপেল বরই চাষ করে ভাগ্য বদল হয়েছে প্রবাসী আব্দুস সালামের। তার বাড়িও মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায়। প্রবাসী আব্দুস সালাম সম্প্রতি বলেন, ইউটিউব দেখে উৎসাহিত হয়ে মেহেরপুর জেলা থেকে অনলাইনের মাধ্যমে ১৬০টি চারা কুড়িয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে আনেন। পরে ১০টি চারা মারা যায়, তারপর ১৫০টি ছাড়া নিয়ে তার বাড়ির পাশে পরিত্যাক্ত ২৫ শতাংশ জমিতে এই অস্ট্রেলিয়ান বল সুন্দরী আপেল কুল বরই চাষ শুরু গ্রহণ করেন। প্রায় ৮ মাসের মাথায় সবকটি গাছেই বরই আসতে শুরু করে। তার বরই চাষে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার টাকা। আর এখন প্রতি সপ্তাহে অনলাইনে বড়ই বিক্রয় করেন ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার। দিন যতই যাচ্ছে ততই তার বরইয়ের চাহিদা বাড়ছে। তার এই বরই বাগান দেখে আগ্রহী হচ্ছে উপজেলার অনেক ছাত্র ছাত্রী, যুবক ও কৃষকরা।
জানা যায়, উপজেলার কমলগঞ্জ পৌর এলাকার ৮নং ওয়ার্ডের কুমড়াকাফন গ্রামের কৃষক আব্দুল খালিকের ছেলে আব্দুস সালাম, জীবিকার তাগিদে ভাগ্য বদলের আশায় দালাল চক্রের মাধ্যমে গিয়েছিলেন বিদেশ। বিদেশ যাওয়ার পর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন কাজ করতে না পেরে নিঃস্ব হয়ে যান। প্রায় তিন বছর পর বাংলাদেশ রিয়াদ এম্বেসির মাধ্যমে খালি হাতে দেশে ফিরে আসেন আব্দুস সালাম।


