নারীর শুধু ক্ষমতায়নে নয়, জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা অবধি প্রতি পদে পদে তার বাধা। একটা ভ্রমণ সেটা মেয়ে না ছেলে অনেক সময় তার ওপরও নির্ভর করে সেই ভ্রমণের শিশু হয়ে বেড়ে ওঠার এবং পৃথিবীর মুখ দেখার। একটা মেয়েশিশুর শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে নারী হয়ে ওঠার পথটি ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ। তার প্রতি পদে দৃশ্যমান আর অদৃশ্য নানান ধরনের হাজার হাজার বাধা।
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায় নারীর শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পত্তির অধিকার, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক মর্যাদায় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদ নারী ও পুরুষের সম-অধিকার ঘোষণা করলেও এর সুফল আজও অধরা। যদিও স্বাধীনতার পর থেকে বিশেষ করে গত দুই দশকে নারী উন্নয়নের কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। তবে সম্প্রতি এই ধারায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। এই অগ্রগতির পথ এখন নানান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতায় ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া ঘরে-বাইরে অবমাননাকর শব্দের ব্যবহার নারীর জন্য তো রয়েছেই। এসব অবমাননাকর শব্দে নারীর মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি এখনও প্রশ্নের মুখে।
নারীর ক্ষমতায়নের প্রধান দৃশ্যমান বাধাগুলো হলো দারিদ্র্য- দরিদ্রতা নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অভাবে আয়ের সুযোগ এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত হয়ে পড়ে। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী প্রতি ৩ জন মেয়ের ১ জনের বিয়ে ১৮ বছরের আগে (বাল্যবিবাহ) হয়। পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক মানসিকতা পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের গুরুত্ব কম। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও নিরাপত্তাহীনতা এর প্রধান কারণ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও মানসিকতাও একটা বড় কারণ। সমাজে লিঙ্গবৈষম্য ও রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে নারীরা পিছিয়ে থাকে। কর্মক্ষেত্রে ও সামাজিক জীবনে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য একটি বড় বাধা। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও সামাজিক কাঠামো, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা (যেমন যৌন নির্যাতন ও যৌন হয়রানি) এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের অসমতা। অনেক নারী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (ঝউএ-৫) অর্জনে সরকার, পরিবার, সমাজ ও গণমাধ্যমের সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সামাজিক ন্যায়বিচার নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতির মৌলিক পূর্বশর্ত। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও নারী নির্যাতন এবং হয়রানি একটি বড় বাধা, যা নারীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে। আইনি সুরক্ষার অভাব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নারীদের ক্ষমতায়নে বাধার সৃষ্টি করে। কিছু ধর্মীয় কুসংস্কার ও ধর্মের অপব্যবহার আর ভুল ধারণা নারীর উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। সচেতনতার অভাবও একটা বড় কারণ। অনেক নারী তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না থাকায় পিছিয়ে পড়ে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সম্পত্তির মালিকানা, ব্যাংক ঋণ ও ব্যবসায়িক সহায়তায় পিছিয়ে। নিরাপত্তার অভাব, মাতৃত্বকালীন সুবিধার সীমাবদ্ধতা, ডে-কেয়ার না থাকা। উচ্চপদে (ব্যবস্থাপনা/ক্যাডার) নারীর উপস্থিতি ১০%-এর নিচে। রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা হলো সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম। অর্থনৈতিক অক্ষমতা, দলীয় মনোনয়নের সংকট, সামাজিক বাধা প্রধান কারণ।
এ ছাড়া দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের বেশির ভাগ এখনও পুরুষ। তাদের মুখে প্রায়ই শোনা যায়, নারী নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসার কথা। কিন্তু যখন ঐকমত্য কমিশনে প্রশ্ন এলো, নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোটের কিংবা অন্তত ৩৩ শতাংশ আসনে নারীদের মনোনয়ন দেওয়ার, তখন বাদ সাধলেন অনেকেই। বাধা আসায় আপাতত ৫ শতাংশ আর এরপর ১০ শতাংশ মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিয়ে বাহাসের ইতি টানল কমিশন।
তাই স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, তবে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপরিশ কি একেবারেই মূল্যহীন? দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেক নারী, মোট ভোটারের অর্ধেকও তারা। নারীরা কী চান, সেটা জানার বা বোঝার চেষ্টা কোথায়? করণীয় ও অগ্রযাত্রার সুপারিশ হিসেবে- পরিবার ও সমাজে নারীর মর্যাদা ও মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি- বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণরূপে রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ; নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, সমান মজুরি ও মাতৃত্বকালীন সুবিধা নিশ্চিতকরণ; নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা; প্রযুক্তি ও প্রশাসনে নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা; সহিংসতার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার ও আইনের কড়া প্রয়োগ; গণমাধ্যমে ইতিবাচক নারী চিত্র তুলে ধরা।
নারীর ক্ষমতায়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে অর্জন হয়েছে তা দেশের উন্নয়ন যাত্রাকে এগিয়ে নিয়েছে। তবু কাক্সিক্ষত অগ্রযাত্রায় পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা না পাল্টে নারীর ক্ষমতায়নের নামে বড় বড় কিছু পদে নারীদের স্থাপন করলেই সমাজ থেকে লৈঙ্গিক বৈষম্য উঠে যাবে না, কোটি কোটি নারীর জীবন সহজ হয়ে যাবে না।


