শুক্রবার, জানুয়ারি ১৬, ২০২৬

কাউনের সম্ভাবনা ও সংকট—মাঠঘুরে দেখা বর্তমান চাষাবাদের অবস্থা

শেয়ার করুন


দেশের উত্তরাঞ্চলে বহু বছর পর আবার জেগে উঠছে কাউন চাষের অকৃত্রিম সম্ভাবনা। এক সময় গ্রামের সাধারণ মানুষের নিত্য খাদ্য ছিল কাউন। কিন্তু উচ্চফলনশীল ধানের প্রসার, বাজারে কম চাহিদা এবং সরকারি সহায়তার অভাবে এই ঐতিহ্যবাহী খাদ্যশস্যটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, খরা–সহনশীল ফসলের প্রয়োজনীয়তা এবং পুষ্টিকর খাদ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ায় কাউন আবারও কৃষকের আস্থার জায়গায় ফিরে আসছে।

রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে এ বছর কাউনের আবাদ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
আঞ্চলিক কৃষি অফিস সূত্র জানায়—

  • অনাবাদী বালুময় জমি
  • উঁচু চরভূমি
  • নদী–তীরবর্তী এলাকা

এ ধরনের জায়গায় সামান্য পানি ও কম সারেই কাউন ভালো জন্মায়। ফলে কৃষকরা ঝুঁকছে কম খরচে বেশি লাভের এই ফসলটির দিকে।

কৃষকের অভিজ্ঞতা: ‘অল্প বিনিয়োগে ভালো ফলন’

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কৃষক রজব আলী বলেন—
“ধানের খরচ বাড়ছে, পানি নেই। কিন্তু কাউন তো বৃষ্টি–নির্ভরেই বড় হয়। এ বছর আধা বিঘায় চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছি।”

চাষিদের দাবি, ধান–গমের মতো নিয়মিত সেচ, আগাছা দমন বা কীটনাশকের প্রয়োজন না থাকায় কাউন চাষে ঝুঁকি কম এবং লাভ দ্রুত মেলে।

উৎপাদন বৃদ্ধির কারণ

কাউন চাষ বাড়ার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ পাওয়া গেছে—

  • খরা–সহনশীল ফসল
  • খুব কম পানি প্রয়োজন
  • উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম
  • প্রচুর ফাইবার, প্রোটিন ও মিনারেল থাকায় পুষ্টিমান বেশি
  • ডায়াবেটিস রোগীর জন্য উপকারী হওয়ায় বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি

শহরাঞ্চলেও কাউনের আটা দিয়ে রুটি, পায়েস, সিরিয়াল ও স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যা বাজারকে আরও শক্তিশালী করছে।

বাজার পরিস্থিতি: দাম স্থিতিশীল, চাহিদা বাড়ছে

স্থানীয় বাজারগুলোতে প্রতি কেজি কাউনের দাম অন্যান্য স্থানীয় শস্যের তুলনায় স্থিতিশীল। খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি পশুখাদ্য, পোলট্রি ফিড ও স্থানীয় খাদ্য শিল্পেও কাউনের চাহিদা বাড়ছে।

বিক্রেতারা বলছেন,
“গত দুই বছরে কাউনের কেজিপ্রতি দাম ২০–২৫% বেড়েছে। চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন এখনো সীমিত।”

চ্যালেঞ্জ: বীজ–সংকট ও সরকারি সহায়তা কম

যদিও কাউন চাষ বাড়ছে, তবুও কয়েকটি বড় সমস্যা সামনে এসেছে—

  • মানসম্মত বীজের অভাব
  • আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রশিক্ষণের অভাব
  • সরকারি প্রণোদনা বা ক্রয় কর্মসূচির বাইরে থাকা
  • বাজার–সংরক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল

কৃষকেরা মনে করেন, সরকারি নজরদারি ও গবেষণা বাড়ানো হলে কাউন আবার প্রধান খাদ্যশস্যের কাতারে পৌঁছাতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সপার্টরা বলছেন—
“কাউন জলবায়ু–সহনশীল একটি গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য। চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এটি ভবিষ্যৎ–নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

তারা আরও বলেন, কাউনে গ্লুটেন নেই, ফাইবার বেশি, তাই এটি ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য আদর্শ খাদ্য।

কাউন চাষের বর্তমান অবস্থা কৃষকদের নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। কম খরচে বেশি লাভ, খরা–সহনশীলতা, পুষ্টিকর খাবার হিসেবে জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে কাউন বাংলাদেশের বিকল্প খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষক, বিশেষজ্ঞ ও সরকারি উদ্যোগ একত্রে এগোলে কাউন দেশের একটি সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসলে পরিণত হতে পারে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাম্প্রতিক খবর

এই বিভাগের আরও খবর