দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের রেমিট্যান্স। এর মধ্যে বৃহত্তম অবদান রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। কিন্তু ২০২৬ সালের এলডিসি গ্রাজুয়েশন, জ্বালানি–বিদ্যুৎ সংকট, বন্দর মাশুল বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নানা বিধিনিষেধের কারণে এই খাত বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে। গত চার দশকে পোশাক শিল্পের সমান্তরালে নতুন কোনো বড় রপ্তানিমুখী শিল্প খাত গড়ে না ওঠায় সামগ্রিক অর্থনীতিও ঝুঁকিতে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনার ধাক্কা, বৈশ্বিক মন্দা, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ, ইউরোপে গ্যাস সংকট—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছর ধরে পোশাক খাত নানামুখী চাপে রয়েছে। করোনার সময় বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, রপ্তানি কমে যায়। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ফলে ক্রয়াদেশও কমে যায়।
এ অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরে শুরু হয় তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গ্যাসের দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ এবং পরবর্তীতে শিল্পখাতে আরও ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ডিজেল ও ক্যাপটিভ পাওয়ারের ব্যয়ও বেড়েছে। তবুও শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস–বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ব্যাংক সুদের হার বেড়েছে ১৫ শতাংশে পৌঁছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ, ঋণের শ্রেণিবিন্যাসের সময়সীমা কমানোসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত ব্যাংকিং সহায়তাও পাচ্ছেন না।
শ্রম ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৩ সালে শ্রমিকদের বেতন ৫৬ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ থেকে বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। অপরদিকে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের বেহাল অবস্থা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও অবকাঠামো উন্নয়নে ধীরগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। প্রণোদনা কমানো হয়েছে ৬০ শতাংশ, যা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এদিকে বন্দরের মাশুল এক লাফে ৪১ শতাংশ বাড়ানোয় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
২০২৬ সালের এলডিসি গ্রাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এখনো কোনো দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রতিযোগী দেশগুলো এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে।
বিজিএমইএ পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, দেশে গ্যাস–বিদ্যুৎ সংকট যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যাহত হবে, শ্রমিকদের বেতন–ভাতা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে, সরকারের রাজস্ব আয়ও কমে যাবে। এলডিসি গ্রাজুয়েশনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার মতে, ব্যাংক সুদের হার, এসএমই খাতে ঋণ সংকট, বন্দর মাশুল বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে ব্যবসার ব্যয় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। ভারত ও অন্যান্য দেশ যেখানে পোশাক শিল্পের জন্য বড় আকারের প্রণোদনা দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও একই সংকটে রয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমেছে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, বেকারত্ব ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, দারিদ্র্য ২৮ শতাংশ। রপ্তানিতে বৈচিত্র্য না থাকা এবং কাঁচামালে আমদানিনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিজিএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান বলেন, এলডিসি গ্রাজুয়েশন বড় চ্যালেঞ্জ। গ্যাস–বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ, ব্যাংক সুদ ১০ শতাংশের মধ্যে রাখা, এফটিএ চুক্তি, ব্যবসা সহজীকরণ এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা ছাড়া এই খাত টিকে থাকবে না।
তিনি বন্দর মাশুল বাড়ানোর বিষয়েও তীব্র সমালোচনা করেন। তার মতে, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই মাশুল বাড়ানো হয়েছে, অথচ বন্দরের কর্মক্ষমতা এখনো বিশ্বের অনেক নিচের অবস্থানে।
শ্রমিক অসন্তোষ ও ক্রমবর্ধমান শ্রমিক সংগঠনের সংখ্যাকেও তিনি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, শ্রমিক সংগঠনগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে।
সামগ্রিকভাবে, বিদ্যুৎ–গ্যাস সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া এবং এলডিসি গ্রাজুয়েশনের চাপ—সব মিলিয়ে তৈরি পোশাক শিল্পই নয়, পুরো অর্থনীতিই বড় ঝুঁকির মুখে পড়েছে।


